ইতালির সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের আগে দেখে নিন বিস্তারিত। ইতালি (Italy) হচ্ছে শিল্প, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের এক অপরূপ মিশ্রণ। প্রতিবছর প্রায় ৬ কোটি পর্যটক এই দেশটি ঘুরতে আসেন। রেনেসাঁর জন্মভূমি, রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, চমৎকার সব উপকূলীয় শহর আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কি নেই এখানে। চলুন এক এক করে জেনে নিই ইতালির সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে।
আরও: ঢাকার সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান
১. রোম
রোম (Rome) বর্তমানে ইতালির রাজধানী হলেও একসময় এটি পুরো পৃশ্চিম বিশ্ব শাসন করেছে। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহর। প্রতিবছর প্রায় ৯০ লক্ষ পর্যটক রোম ভ্রমণ করেন।

কোলোসিয়াম রোমের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা। খ্রিস্টীয় ৭০-৮০ সালের দিকে নির্মিত এই বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটারে একসময় গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ হতো। ৫০,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্থাপনাটি আজও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাম্ফিথিয়েটার। কোলোসিয়ামে প্রবেশের টিকেট দিয়ে আপনি রোমান ফোরাম এবং প্যালাটাইন হিলেও ঘুরতে পারবেন।
ভ্যাটিকান সিটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র হলেও এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অসাধারণ। ভ্যাটিকান মিউজিয়ামে আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্পকর্মের সংগ্রহ। সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা ফ্রেস্কো দেখতে হলে অবশ্যই এখানে আসতে হবে। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা একটি অসাধারণ রেনেসাঁ স্থাপত্যের নিদর্শন, যা নির্মাণে ১০০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। এছাড়াও রোমে আছে ট্রেভি ফাউন্টেন, প্যানথিয়ন, স্প্যানিশ স্টেপস আর রোমান ফোরামের মতো অসংখ্য দর্শনীয় স্থান।
২. ফ্লোরেন্স
ফ্লোরেন্স (Florence) রেনেসাঁ যুগের জন্মস্থান এবং ইতালির শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। টাস্কানি অঞ্চলের এই শহরটি তার অসাধারণ স্থাপত্য আর শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত।

উফিজি গ্যালারি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর। এখানে বোত্তিচেল্লি, মাইকেলেঞ্জেলো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আর তিতিয়ানের মতো মহান শিল্পীদের কাজ দেখতে পাওয়া যায়। ইতালীয় রেনেসাঁ শিল্পের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ এই গ্যালারিতে রয়েছে। ডুওমো বা ফ্লোরেন্সের ক্যাথিড্রাল শহরের আকাশরেখায় রাজত্ব করে। ব্রুনেলেস্কির ডিজাইন করা বিখ্যাত গম্বুজ আর জিওত্তোর ক্লক টাওয়ার এই স্থাপনার প্রধান আকর্ষণ। মার্বেল দিয়ে তৈরি এই ক্যাথিড্রালের সৌন্দর্য সত্যিই অতুলনীয়।
আকাডেমিয়া গ্যালারিতে আছে মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত ডেভিড মূর্তি। এছাড়া পন্তে ভেকিও ব্রিজ, পালাজ্জো ভেকিও আর পিয়াজালে মাইকেলেঞ্জেলোর মতো জায়গাগুলো ফ্লোরেন্সকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।
৩. ভেনিস
ভেনিস (Venice) পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে রাস্তার বদলে আছে খাল, আর গাড়ির বদলে আছে গন্ডোলা! ১১৭টি ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই শহরটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।

গ্র্যান্ড ক্যানাল ভেনিসের প্রধান জলপথ বা যাতায়াতের পথ। গন্ডোলা বা ভাপোরেট্টোতে চড়ে এই খাল দিয়ে ভ্রমণ করলে পাবেন অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। দু’পাশে সারিবদ্ধ রঙিন প্রাসাদ আর প্রাচীন ভবন দেখতে দেখতে পুরো শহরটা ঘুরে দেখা যায়। সেন্ট মার্কস স্কোয়ার ভেনিসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আছে সেন্ট মার্কস বেসিলিকা, যার স্থাপত্যশৈলী বাইজেন্টাইন ও গথিক ধরনের মিশ্রণ। ডোজেস প্যালেস ভেনিসের প্রাক্তন শাসকদের বাসভবন ছিল, এখন এটি একটি জাদুঘর।
রিয়াল্টো ব্রিজ গ্র্যান্ড ক্যানালের উপর নির্মিত সবচেয়ে পুরনো এবং বিখ্যাত সেতু। ভেনিসে ফেব্রুয়ারিতে হয় বিখ্যাত ভেনিসিয়ান কার্নিভাল, যখন পুরো শহর মাস্ক আর উৎসবে মেতে ওঠে।
৪. আমালফি কোস্ট
ইতালির দক্ষিণে নেপলসের কাছে অবস্থিত আমালফি কোস্ট (Amalfi Coast) পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর উপকূলীয় অঞ্চল গুলর মধ্যে একটি। এখানে রয়েছে, খাড়া পাহাড়ের গায়ে রঙিন বাড়ি, নীল সমুদ্র আর লেবুর বাগান। পজিতানো আমালফি কোস্টের সবচেয়ে ফটোজেনিক শহর। পাহাড়ের ঢালে সারিবদ্ধ পাস্তেল রঙের বাড়িগুলো দেখতে অসাধারণ লাগে। এখানকার সৈকত, বুটিক শপ আর রেস্তোরাঁগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

আমালফি শহরটি যার নামে এই উপকূলের নামকরণ করা হয়েছে। এখানকার ক্যাথিড্রাল সান্ত’আন্দ্রেয়া অসাধারণ স্থাপত্যের নিদর্শন। সরু গলি, ছোট্ট দোকান আর সমুদ্রের পাশে ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়ার অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়। রাভেলো একটু উঁচুতে অবস্থিত শহর, যেখান থেকে পুরো উপকূলের দৃশ্য দেখা যায়। ভিলা চিমব্রোন এবং ভিলা রুফোলোর বাগানগুলো অপূর্ব সুন্দর।
৫. সিনকুয়ে তেরে
ইতালিয়ান রিভিয়েরায় অবস্থিত সিনকুয়ে তেরে (Cinque Terre) তে পাঁচটি ছোট্ট মাছ ধরার গ্রাম রয়েছে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে স্বীকৃত এই অঞ্চলটি রঙিন বাড়ি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে। এখানের পাঁচটি গ্রাম হলো মন্তেরোসো আল মারে, ভের্নাজ্জা, কর্নিগ্লিয়া, মানারোলা এবং রিওমাজিওর। প্রতিটি গ্রামেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। মানারোলা এবং রিওমাজিওরের সূর্যাস্ত দেখার মতো।

এই গ্রামগুলোর মধ্যে হাইকিং ট্রেইল আছে, যা দিয়ে হেঁটে সমুদ্রের পাশ দিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়া যায়। ট্রেনেও সহজেই যাতায়াত করা যায়। আমালফি কোস্টের তুলনায় এখানে ভিড় কম এবং খরচও কম, কিন্তু সৌন্দর্যে কোনো কমতি নেই।
আরও: বিশ্বের সেরা ১০ ভ্রমণ গন্তব্য
৬. মিলান
মিলান (Milan) ইতালির আর্থিক ও শিল্প রাজধানী। ফ্যাশন উইক, লাক্সারি ব্র্যান্ড আর আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য বিখ্যাত এই শহর। কিন্তু ইতিহাস আর শিল্পকর্মেও এর অবদানও কম নয়। ডুওমো দি মিলানো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গথিক ক্যাথিড্রাল। ১৩৮৬ সালে এর নির্মাণ শুরু হয় এবং কয়েক শতাব্দী ধরে এটি তৈরি হয়েছে। সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এই ক্যাথিড্রালের চূড়ায় মাদোন্নিনা নামে একটি সোনালি মূর্তি আছে, যা মিলানের প্রতীক। ছাদে উঠে পুরো শহরের দৃশ্য দেখা যায়।

লাস্ট সাপার লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা বিশ্ববিখ্যাত ম্যুরাল, যা সান্তা মারিয়া দেল্লে গ্রাজিয়ে চার্চে রয়েছে। এটি দেখতে হলে অনেক আগে থেকে টিকেট বুক করতে হয়। গ্যালেরিয়া ভিত্তোরিও এমানুয়েলে ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি চমৎকার কাচের ছাদযুক্ত শপিং মল। এখানে বিলাসবহুল দোকান, ক্যাফে আর রেস্তোরাঁ আছে।
৭. পিসা
পিসা (Pisa) মূলত হেলানো টাওয়ারের জন্যই বিখ্যাত। কিন্তু এই ছোট্ট টাস্কান শহরে আরও অনেক কিছু দেখারমত আছে। পিসার হেলানো টাওয়ার প্রকৃতপক্ষে পিসা ক্যাথিড্রালের বেল টাওয়ার। ৫৬ মিটার উঁচু সাদা মার্বেলের এই টাওয়ার নির্মাণের সময় মাটি ধসে যাওয়ায় হেলে গিয়েছিল। এখন এটি পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা। টাওয়ারের উপরে উঠে পিসার দৃশ্য দেখা যায়, তবে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় এবং হেলানো থাকায় উঠতে একটু কষ্ট হয়।

পিয়াজা দেই মিরাকোলি বা মিরাকেলস স্কোয়ারে টাওয়ার ছাড়াও আছে সুন্দর ক্যাথিড্রাল এবং ব্যাপটিস্ট্রি। পুরো এলাকাটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ফ্লোরেন্স থেকে খুব কাছে হওয়ায় দিনে ঘুরে আসা যায়।
৮. ডলোমাইটস
উত্তর ইতালির ডলোমাইটস (Dolomites) পর্বতমালা প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য একটি আদর্শ দর্শনীয় স্থান। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এই পর্বতমালায় প্রায় ৩,৫০,০০০ একর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। থ্রি পিকস ডলোমাইটসের সবচেয়ে চেনা ল্যান্ডমার্ক। তিনটি বিশাল পাথরের চূড়া একসাথে দাঁড়িয়ে আছে, যা দেখতে অসাধারণ লাগে। আলপে দি সিউসি ইউরোপের সবচেয়ে বড় আলপাইন মেডো, যেখান থেকে পর্বতের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।

গ্রীষ্মকালে এখানে হাইকিং আর ট্রেকিং করা যায়, শীতকালে স্কিইং এর জন্য আদর্শ। অর্টিসেই, বোলজানো বা কর্টিনা দ’আমপেজ্জোর মতো মনোরম শহরে থাকার ব্যবস্থা আছে। ডলোমাইটসের সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় পাহাড়গুলো গোলাপি-কমলা রঙে রঞ্জিত হয়, যাকে বলা হয় “এনরোসাদিরা” – এক অপূর্ব দৃশ্য।
৯. সিসিলি
ইতালির সবচেয়ে বড় দ্বীপ সিসিলি (Sicily) ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিশ্রণ। এখানে গ্রিক, রোমান, আরব আর নরম্যান সভ্যতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। পালের্মো হচ্ছে সিসিলির রাজধানী। এখানকার ক্যাথিড্রাল, রয়্যাল প্যালেস আর স্থানীয় বাজারগুলো দেখার মতো। তাওরমিনা একটি পাহাড়ি শহর যেখান থেকে সমুদ্র আর মাউন্ট এটনা আগ্নেয়গিরির দৃশ্য দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিক থিয়েটার এখানকার প্রধান দর্শনীয় স্থান।

ভ্যালি অফ দ্য টেম্পলস আগ্রিজেন্টোতে অবস্থিত গ্রিক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। সিরাকিউজ মহান বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের জন্মস্থান, যেখানে প্রাচীন রোমান এবং গ্রিক স্থাপত্য দেখা যায়।
আরও: পাকিস্তানের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান
১০. লেক গার্দা
উত্তর ইতালির লেক গার্দা (Lake Garda) হচ্ছে ইতালির সবচেয়ে বড় হ্রদ। আল্পস পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা এই হ্রদের চারপাশে ছোট ছোট সুন্দর শহর ছড়িয়ে আছে। সিরমিওনে লেক গার্দার সবচেয়ে জনপ্রিয় শহর। এখানে আছে মধ্যযুগীয় দুর্গ আর প্রাচীন রোমান ভিলার ধ্বংসাবশেষ। থার্মাল স্প্রিংস এখানকার বিশেষ দর্শনীয় স্থান গুলোর একটি।

রিভা দেল গার্দা হ্রদের উত্তর দিকে অবস্থিত, যেখান থেকে পর্বতের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। এখানে উইন্ডসার্ফিং আর কায়াকিং করা যায়।
ফেসবুক: Kuhudak